ওজন কমানোর জন্য হাঁটার পদ্ধতি

সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করা কতটা প্রয়োজন এটা আমরা সবাই জানি। বাড়তি ওজন রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় আর সেই সাথে মানসিকভাবেও অস্বস্তিতে রাখে। ব্যস্ত জীবনে রেগ্যুলার জিমে গিয়ে এক্সারসাইজ করার সময় হয়ে ওঠে না অনেকেরই। কিন্তু ফিট তো থাকতেই হবে। ডায়েটিং, টুকটাক শরীরচর্চা, মাঝে মধ্যে সময় করে অথবা অফিসে যাওয়ার সময় কিংবা অফিস থেকে ফেরার পথে হেঁটেই বাসায় যাওয়া, এগুলো কিন্তু আমরা অনেকেই করে থাকি।


সত্যি সত্যিই হেঁটে ওজন কমাতে হলে অন্তত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন। হিসাবটা সোজা, আপনি যত দ্রুতগতিতে হাঁটবেন প্রতি মিনিটে আপনার তত বেশি ক্যালরি পুড়বে। আলসেমি করে হাঁটলে প্রতি মিনিটে হয়তো ৩ ক্যালরির মতো পুড়বে। আর হাঁটা বাদ দিয়ে পুরোপুরি দৌড়াতে শুরু করলে ক্যালরি পোড়ানোর হার আরও বাড়তে থাকবে।

তবে হাঁটলেই যদি ক্যালরি পোড়ে তাহলে সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত হেঁটেও কেন অনেকের ওজন কমে না? অনেকে তো বছরের পর বছর ধরে হেঁটেও ওজন কমাতে পারেন না! কেউ কেউ হয়তো বলবেন ওজন কমানোই তো হাঁটাহাঁটির একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কথা সত্যি। ওজন কমানো ছাড়াও নিয়মিত হাঁটার অন্য অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আছে। কিন্তু যাঁরা প্রধানত ওজন কমানোর জন্যই হাঁটছেন? কোন বিষয়গুলোতে সচেতন থাকলে হেঁটে ওজন কমানো সম্ভব তা জেনে নেওয়া জরুরি।

হেঁটে ওজন কমানোর উপায় 

যারা ওজন কমানোর জন্যই হাঁটছেন, কোন বিষয়গুলোতে সচেতন থাকলে হেঁটে ওজন কমিয়ে ফেলতে পারবেন সেটা জেনে নেওয়া জরুরি। চলুন তাহলে হেঁটে ওজন কমানোর কার্যকরী উপায়গুলো জেনে নেই।

কতক্ষণ হাঁটবেন

হিসাব কষলে দেখা যাবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষেরা স্বাভাবিক দ্রুতগতিতে হেঁটে প্রতি মিনিটে চার-পাঁচ ক্যালরি পোড়াতে সক্ষম হন। অর্থাৎ ১৫ মিনিট হাঁটলে ৭০ ক্যালরির মতো পোড়ানো সম্ভব। কিন্তু তা তো এক স্লাইস রুটির চেয়েও কম ক্যালরি। সত্যি সত্যিই হেঁটে ওজন কমাতে হলে অন্তত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন।

কত দ্রুত হাঁটবেন

হিসাবটা সোজা, আপনি যত দ্রুতগতিতে হাঁটবেন প্রতি মিনিটে আপনার তত বেশি ক্যালরি পুড়বে। আলসেমি করে হাঁটলে প্রতি মিনিটে হয়তো ৩ ক্যালরির মতো পুড়বে। আর একটু বেশি গতিতে হাঁটলেই এর প্রায় দ্বিগুণ ক্যালরি খরচ হবে। আর আপনি যদি দৌড়ানো বা জগিং করা শুরু করেন, তাহলে ক্যালরি পোড়ানো দ্রুত হাঁটার চেয়েও দ্বিগুণ বাড়বে। আর হাঁটা বাদ দিয়ে পুরোপুরি দৌড়াতে শুরু করলে ক্যালরি পোড়ানোর হার আরও বাড়তে থাকবে।

হাঁটতে যাওয়ার আগে গ্রিন টি পান করুন 

 ক্যাফেইন এবং ক্যাটাচিন্সের (catechins) সঠিক সমন্বয় ফ্যাট বার্ন করার জন্য বেশ কার্যকর। আর মেটাবলিজম (Metabolism) ঠিক থাকলে এক্সট্রা ওয়েট কমিয়ে ফেলতে সময় কম লাগে। ঠিক এই কাজটিই গ্রিন টি করে। তাই হাঁটতে যাওয়ার আগে রেগ্যুলার গ্রিন টি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন।

প্রতিদিন ১৫ হাজার পদক্ষেপ হাঁটুন

১৫ হাজার পদক্ষেপ! কি বেশি মনে হচ্ছে? কিন্তু হাঁটার অভ্যাস যখন করে ফেলবেন, তখন একদমই বেশি মনে হবে না। আপনার স্মার্টফোনে স্টেপ ট্র্যাকার অথবা স্টেপ কাউন্টার অ্যাপ ডাউনলোড করে নিন। স্মার্টফোনের এসব ফিটনেস ট্র্যাকার থেকে কত পদক্ষেপ হাঁটছেন সেটা গণনা করা যায়। আর অনেক স্মার্ট ওয়াচেও আপনি এই ফিচার পেয়ে যাবেন। প্রথমদিকে সাবলীলভাবে হাঁটুন, আস্তে আস্তে স্টেপ বাড়াতে হবে। আপনি যত দ্রুত গতিতে হাঁটবেন প্রতি মিনিটে আপনার তত বেশি ক্যালোরি খরচ হবে। এতে দ্রুত এক্সট্রা ওজন কমবে।

প্রতিদিন ৩ বার ২০ মিনিট করে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন 

একটানা লম্বা দূরত্ব একবারে হাঁটার বদলে তিনবার বিশ মিনিট করে হাঁটুন। সহজ ভাষায়, প্রতিদিন যেমন তিন বেলায় খাবার খান, তেমনি তিন বেলা হাঁটতে হবে। প্রতিবেলা খাওয়ার পর হাঁটাহাঁটিতে বাড়তি ক্যালোরি বার্ন হয়ে যায়। এতে ওজন কমার পাশাপাশি আপনার সুগার লেভেলও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

হাঁটার মধ্যে একটু বিরতি নিন  

কোনো কাজই একটানা ভালো লাগে না। একঘেয়েমিতা কাটাতে কিছুক্ষণ হাঁটার পর এক মিনিটের বিরতি নিতে পারেন। এতে দেহে পুনরায় শক্তি ফিরে আসবে। একটু বিরতি নিয়ে আবারো হাঁটা শুরু করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে বিরতি নিয়ে হাঁটলে ২০% দ্রুত গতিতে ফ্যাট বার্ন হয়।

চিনিসমৃদ্ধ পানীয়কে না বলুন 

হাঁটার সময় বা হাঁটার পরে মিল্কশেক, ফ্রুট জুস, সফট ড্রিঙ্কস খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। এতে আপনার হাঁটাহাঁটির পুরো চেষ্টাটাই বৃথা হয়ে যেতে পারে। কারণ ওজন কমাতে হলে যে পরিমাণ খাবেন তার চেয়ে বেশি ক্যালোরি পোড়াতে হবে। চিনি জাতীয় খাবারের মাধ্যমে যেই ক্যালোরি ইনটেক করছেন, হয়তো হেঁটে সেটা বার্ন করতে পারেননি। তাই এসব পানীয়কে না বলুন সবসময়।

পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খাবেন

যথেষ্ট পরিমাণ পানি খেলে ওজন হ্রাসের প্রক্রিয়া দ্রুত হবে। প্রতিদিন ১.৫ লিটার পানি পান করলে বছরে ১৭৪০০ ক্যালোরি পুড়বে। দিনে অন্তত ৮ গ্লাস পানি খেতে ভুলবেন না।

ঊর্ধ্বমুখী হাঁটতে পারেন 

খেয়াল করলে দেখবেন, আপনি যখন কোন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বা উঁচু রাস্তায় হাঁটা শুরু করেন তখন বেশ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং হার্ট বিট বেড়ে যায়। জানেন কি এতে আপনার পেশিও সুগঠিত হয়? একটু থেমে থেমে ধীর স্থিরভাবে চড়াইয়ের দিকে ওঠার অভ্যাস করুন, আস্তে আস্তে গতি বাড়ান। একটু বেশি গতিতে হাঁটলেই প্রায় দ্বিগুণ ক্যালোরি খরচ হবে।

লিফট নয়, সিঁড়ি ব্যবহার করুন

অফিসে বা বাসায় লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ফ্যাট কমানোর জন্য কতকিছুই তো করছেন, এই সামান্য একটা পদক্ষেপ আপনার অনেক বড় উপকার করবে।

পছন্দের গান শুনতে শুনতে হাঁটুন 

হাঁটতে বের হবেন, কিন্তু সঙ্গী পাচ্ছেন না? সমস্যা নেই, মিউজিককেই আপনার বন্ধু করে নিন। পছন্দের গান বাজতে থাকলে অবসাদ কিভাবে যেন চট করে পালিয়ে যায়। প্রাণবন্ত প্লে-লিস্ট আপনাকে চাঙ্গা রাখবে আর একাকীত্ব তো কাটবেই। ইয়ারফোনে গান শুনতে শুনতে আপনি যে কতদূর হেঁটে ফেলেছেন নিজেও বুঝবেন না! হাঁটার স্পীড আর ওয়াকিং টাইম দুটাই বাড়বে।

হেঁটে এসে কী খাবেন

অনেক প্রাতভ্রমণকারীরই অভ্যাস হেঁটে এসে নাশতা করা। অনেককেই দেখা যায় সকালে হাঁটাহাঁটির পর চা-সিঙ্গারা-সমুচাজাতীয় নাশতা করতে। কিন্তু এতে আপনার হাঁটাহাঁটির পুরো চেষ্টাটাই বৃথা হয়ে যেতে পারে। ধরুন আপনি দ্রুতগতিতে ৪৫ মিনিট হাঁটলেন, তাতে আপনি শরীর থেকে ২০০ ক্যালরির মতো পোড়াতে পারলেন। এবার আপনি একটা সমুচা এবং এক কাপ চা খেলেন। এতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বা তার চেয়েও বেশি ক্যালরি যোগ হবে। এর চেয়ে হাঁটা শেষে একটু ফল খান কিংবা একটু বিশ্রাম নিয়ে সরাসরি নিয়মিত সকালের নাশতা খেতে বসুন। এইটুকু হাঁটার কারণে নিজেকে বাড়তি খাবার দিয়ে যত্ন-আত্তি করলে তো আর ওজন কমবে না!

হাঁটার সঙ্গে সামান্য ব্যায়াম

আমাদের শরীর খুব অল্প দিনেই আমাদের অভ্যাসগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে হাঁটাহাঁটির অভ্যাসটা আয়ত্ত হয়ে গেলে শরীরও এতে মানিয়ে নেয়। কিন্তু এটা আপনার জন্য ভালো না! কারণ হাঁটার একটা নির্দিষ্ট ধরন দাঁড়িয়ে গেলে দিন দিন একই দূরত্বে হেঁটেও আপনার ক্যালরি পোড়ানো কমে যেতে থাকবে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কিছুদিন পর পর শরীরকে নতুন কিছু ব্যায়াম করতে শুরু করুন। প্রথমে কিছুদিন হাঁটার সঙ্গে একটু করে দৌড়ান বা একটু করে যোগব্যায়াম করুন। এগুলোতে একঘেয়ে হয়ে গেলে কিছুদিন হাঁটার পাশাপাশি ভারোত্তোলন করুন বা একটু টেনিস বা ব্যাডমিন্টন খেলুন। এভাবে আপনার ওজন যেমন কমবে, তেমনি হাঁটাহাঁটিতেও একঘেয়েমি আসবে না।

খাবারে খাওয়ায় সচেতন হওন

আমাদের চারপাশে এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে মরিয়া হয়ে ব্যায়াম করেন। কিন্তু কোমরের মাপ একটুও কমে না! কারণটা খুবই স্পষ্ট। তাঁরা ব্যায়ামের পর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খান। হিসাবে করে দেখুন এক ঘণ্টা হাঁটলে ২৫০ ক্যালরির মতো পুড়বে। খাবারের হিসাবে একটা ডিম আর দুই স্লাইস রুটি খেলেই তা পূরণ হয়ে যাবে। ওজন কমাতে হলে যে পরিমাণ খাবেন তার চেয়ে বেশি ক্যালরি পোড়াতে হবে।

হাঁটাই যথেষ্ট নয়

নিয়ম মেনে কিছুদিন হাঁটার পরও যদি আপনার ওজন না কমে তাহলে অবশ্যই আপনার শরীরচর্চার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই হাঁটাহাঁটির পাশাপাশি খাবারদাবারের পুষ্টিমান নিয়ে সজাগ হোন। কী খাবেন আর কী কী খাবেন না, সে বিষয়ে ভাবুন। এ ছাড়া এমন তো হতেই পারে যে, আপনার শারীরিক সমস্যাগুলোর বিষয়ে আপনি পুরোপুরি সজাগ নন। একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসক হয়তো আপনাকে সমস্যাটা চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারেন।

ব্যস, জেনে নিলেন হেঁটে ওজন কমানোর কিছু উপায় । তবে হ্যাঁ, শুধু হাঁটলেই হবে না। এর সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের অভ্যাস, পরিমিত ঘুম সবকিছুই প্রয়োজন। জানেন তো, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্বাস্থ্যের জন্য একটু সচেতন তো থাকতেই হবে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

Post a Comment

0 Comments