ব্রেস্ট বা স্তন ক্যান্সার নারীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। সমগ্র বিশ্বে নারীদের ক্যান্সার জনিত কারণে মৃত্যুবরণের অন্যতম প্রধান কারণ ব্রেস্ট ক্যান্সার। পশ্চিম বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব বেশী থাকলেও এখন সাউথ ইস্ট এশিয়ান দেশে এই রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। স্তন ক্যান্সার বাংলাদেশে আগের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। আগে 40-এর কম বয়সী রোগী বিরল ছিল। অথচ আজ 17 বছরের বালিকাও এ রোগের করুণ শিকার হচ্ছে।
আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এতোদিন এই ক্যান্সারের ব্যাপারে নারীদের সচেতন করার জোরটা ছিল বেশি, কিন্তু এখন পুরুষদেরকেও সচেতন করার জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কারণ, পুরুষদের মধ্যেও স্তন ক্যান্সার দেখা দিতে পারে। যদিও পুরুষদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার খুবই কম। এক হিসেবে দেখা যায় যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর 41 হাজার মহিলা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, সেই তুলনায় মাত্র 300 জন পুরুষ এই রোগে আক্রান্ত হন।
সারা বিশ্বে 11 অক্টোবরকে ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা দিবস এবং অক্টোবর মাস ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর প্রায় 14,836 জন নারী ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং তাদের মধ্যে প্রায় 7,142 জন মৃত্যু বরণ করেন। এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে প্রতি বছর সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও অক্টোবর মাস স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়।
স্তন ক্যান্সার কী?
স্তনের কিছু কোষ যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে তখন স্তন ক্যান্সার হতে দেখা যায়। তখন এই অনিয়মিত ও অতিরিক্ত কোষগুলো বিভাজনের মাধ্যমে টিউমার বা পিন্ডে পরিনত হয় এবং রক্তনালী লসিকা ও অন্যান্য মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই ক্যান্সার রোগের বিষয়ে আতঙ্কের কারণ। কেন? কারণ এমতাবস্থায় বিভিন্ন ধরনের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাহায্য নিয়েও রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা বা দীর্ঘ জীবনকালের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। আশার বিষয় হচ্ছে, স্তন ক্যান্সার যদি আমরা ‘Early State’ বা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারি তবে তা সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে প্রায় শতভাগ নিরাময় করা যায়।
কেন বাড়ছে স্তন ক্যান্সার?
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ মার্থা হাজরার মতে, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের হানার অন্যতম কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ভারতে প্রান্তিক অঞ্চল তো বটেই, এমনকি শহুরে এলাকাতেও অনেক সময় মেয়েদের নানা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়। যৌনাঙ্গের পরিচর্যা করার উপায় বা সুযোগও খুব কম থাকে। এ ছাড়াও ভারতীয় মেয়েদের মধ্যে আজকাল ধূমপান ও মদ্যপানের প্রবণতা বেড়েছে। এতেও এই ধরনের মেয়েলি অসুখগুলো বেশি করে চেপে ধরছে। পিরিয়ডের সময় অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় থাকা, দীর্ঘক্ষণ অন্তর্বাস বদলানোর উপায় না পাওয়া-এগুলোও রোগ হওয়ার ছোট-বড় নানা অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে আসছে।
এ ছাড়া সচেতনতার অভাবও এর জন্য দায়ী। তাই বছর বছর নানা প্রচার অভিযান সত্ত্বেও এই রোগ কমছে না। তবে শুধু রোগীকে দায়ী করেও লাভ নেই। ভারতীয় গ্রামগুলোয় বা ছোটখাটো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই অসুখ পরীক্ষা করার মতো পরিকাঠামো ও চিকিৎসকও থাকেন না।
ক্যানসার মানেই প্রচুর খরচ, অনেক হয়রানি-এই ধারণা গেঁথে রয়েছে মনে। তাই অনেক পরিবারই এই অসুখ ধরা পড়লে বিকল্প চিকিৎসা বা অল্টারনেটিভ মেডিসিনে ভরসা করতে শুরু করেন। অনেক সময় এটি থেকেও রোগ বড় আকার ধারণ করে।
ভারতীয় নারীরা অফিস সামলে, ঘরের কাজ করে নিজের দিকে তাকান না খুব একটা। যেটুকু যত্ন তাঁদের দরকার, সেটুকুতেও থেকে যায় ঘাটতি। ব্যায়াম, ডায়েট, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ, ধূমপান-মদ্যপান এগুলোও ফ্যাক্টর।
বয়স একটা বড় রিস্ক ফ্যাক্টর। ইদানীং মানুষের গড় আয়ু অনেক বেড়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যান্সারেরও ঝুঁকিও বাড়ে। আর এই কারণেই ইদানীং স্তন ক্যান্সারও বাড়ছে।
দেরিতে বিয়ে বা বিয়ে না করা কিংবা সন্তান না হওয়া স্তন ক্যান্সার ডেকে আনতে পারে। অল্প বয়সে মেনার্কি অর্থাৎ পিরিয়ড শুরু হওয়া এবং বেশি বয়সে মেনোপজ হলে দীর্ঘদিন ইস্ট্রোজেনের সঙ্গে সহবাস করতে হয়। ইস্ট্রোজেন ক্যান্সারের রিস্ক বাড়ায়। সন্তানকে ব্রেস্ট ফিডিং না করালেও ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে।
বংশে এর আগে কোনও নারীর ব্রেস্ট বা ওভারি ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি বেশি। বিএআরসিএ 1, ও বিএআরসি 2, জিন থাকলে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বেশি।
লক্ষণ বা উপসর্গ
- স্তনের কোন অংশ চাকা চাকা হয়ে যাওয়া অথবা কোন লাম্প দেখা যাওয়া।
- স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন।
- স্তনবৃন্তের আকারে পরিবর্তন।
- স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত বা তরল পদার্থ বের হওয়া।
- স্তনবৃন্তের আশেপাশে রাশ বা ফুসকুড়ি দেখা যাওয়া।
- বগলে ফুলে যাওয়া বা চাকা দেখা দেয়া।
- স্তনের ভেতরে গোটা ওঠা বা শক্ত হয়ে যাওয়া।
স্তন ক্যান্সার এ আক্রান্ত হওয়ার কারণ সমূহ:
এখন আমরা জানব কি কি কারণে স্তন ক্যান্সার হয়। তবে আক্রান্ত হওয়ার 2টি দিক আছে । 1। আক্রান্ত হওয়া থেকে বেচে থাকা সম্ভব। 2। আক্রান্ত হওয়া থেকে বেচে থাকা সম্ভব নয়।
স্তন ক্যান্সার এর পরিবর্তনযোগ্য কারণসমূহ
1. অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত বিয়ে না করা এবং 30 বছর বয়সের পর নারীদের প্রথম সন্তানের মা হওয়া কিংবা সন্তান না নেয়া মহিলাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়।
2. সন্তানকে নিয়মিত বুকের দুধ না খাওয়ানোর অভ্যাসের কারণে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
3. যারা অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত খাবার খান এবং খাদ্যতালিকায় একেবারেই শাক সবজি রাখেন না তাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়াও দীর্ঘসময় টিনজাত খাবার খাওয়া, প্রিজারভড খাবার, কৃত্তিম মিষ্টি ও রঙযুক্ত খাবার খাওয়া নারী ও পুরুষের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার জন্য দায়ী।
4. অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া এবং শারীরিক পরিশ্রম একেবারেই না করা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
5. দীর্ঘদিন এয়ার ফ্রেশনার, কীটনাশক, অতিরিক্ত কেমিক্যালযুক্ত কসমেটিকস, ডিওডোরেন্ট এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে থাকলে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
6. ভুল সাইজের ব্রা ব্যবহার করা। স্তনের আকার অনুযায়ী সঠিক মাপের ব্রা ব্যবহার করুন। কেননা নয়তো এটি আপনার স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিতে পারে অনেকখানি। স্তনের আকারের চেয়ে বড় মাপের ব্রা স্তনের টিস্যুগুলোকে ঠিকমত সাপোর্ট দিতে পারে না আবার অতিরিক্ত ছোট বা টাইট ব্রা স্তনের তরলবাহী লসিকাগুলো কেটে ফেলতে পারে।
7. সারাক্ষণ ব্রা বা ব্রেসিয়ার পরে থাকার কারণে ঘাম নির্গত হবার অসুবিধে, আর্দ্রতা জমে থাকা, সব মিলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। ঘরে থাকার সময়টুকুতে এবং রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় ব্রা ব্যবহার না করার চেষ্টা করুন।
8. লেবেল না দেখে ডিওডোরেন্ট কেনা। আজকাল কর্মজীবী নারী হোক বা শিক্ষার্থী, সারাদিনের বাইরে থাকা আর সেই সাথে ঘামের দুর্গন্ধ এড়াতে ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করেন প্রায় সবাই। কিন্তু এই ডিওডোরেন্ট কেনার সময় খেয়াল রাখুন কী কী উপাদান আছে এতে। অ্যালুমিনিয়াম বেইজড উপাদান থাকলে তা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ডিওডোরেন্ট যেহেতু আপনি প্রতিদিন ব্যবহার করেন, তাই কোন কোম্পানির পণ্যটি ব্যবহার করবেন তা আগে একজন স্কিন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিন।
স্তন ক্যান্সার এর অপরিপবর্তনযোগ্য কারণসমূহ
9. জেনেটিক কিছু কারণে মানুষ স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। বিআরসিএ১, বিআরসিএ২ নামের জিনের মিউটেশন 5% থেকে 10% স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ী থাকে।
10. বংশগত কারণে এই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন অনেকেই। যেমন-মা, খালা, বোন বা মেয়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেকাংশে।
11. মহিলাদের মাসিক শুরু এবং বন্ধের বয়সের ওপরেও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নির্ভর থাকে। যাদের 12 বছর বয়সের পূর্বে মাসিক শুরু এবং 50 বছর বয়সের পর মাসিক বন্ধ হয় তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
12. অ্যাস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। যারা দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত অ্যাস্ট্রোজেন হরমোনের সংস্পর্শে থাকেন, মাসিক বন্ধ হওয়ার পর মহিলাদের মধ্যে যারা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি গ্রহণ করেন, তাদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
13. লিঙ্গভেদে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একজন নারী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকেন।
14. বয়স বাড়ার সাথে স্তন ক্যান্সারের আক্রান্তের সম্ভাবনা বাড়ে বিশেষ করে 50 বছর বয়সের পর এই ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়, যা পরিবর্তন যোগ্য নয় মোটেও।
কিভাবে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়
স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক প্রতিরোধঃ
* বিয়েশাদী বা পথম সন্তান ধারণ ৩০ বছরের আগেই সম্পন্ন করতে হবে।
* শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে হবে।
* সাস্থ্যকর, সুষম খ্যাদ্যাভাস ও নিয়মিত শরীর চর্চার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
* ধূমপান, পান-জর্দা, বা অন্যান্য তামাক জাতীয় দ্রব্য সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে।
* নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার অভ্যাস করতে হবে।
যেসব খাবার স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে
স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যযুক্ত খাবারের সাথে খাবারের সঠিক সেট অন্তর্ভুক্ত হওয়া ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে এবং স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধকে সমর্থন করতে পারে different বিভিন্ন মেটা-বিশ্লেষণ এবং পর্যবেক্ষণের গবেষণার ভিত্তিতে, এমন কিছু খাবারের উদাহরণ রয়েছে যা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
সয়া খাবার
চীন কাদুরি বিওব্যাঙ্ক (সিকেবি) নামে একটি বৃহত আকারের সম্ভাব্য সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে ২০০ 300,000 থেকে ২০০ between সালের মধ্যে 30০০,০০০ এরও বেশি মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ২০০ China থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে চীনের ভৌগলিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলগুলির তালিকাভুক্ত হয়েছিল। প্রায় 79 বছর এবং 2004 মহিলাদের স্তন ক্যান্সারের রিপোর্টে দেখা গেছে যে সয়া গ্রহণের প্রতি 2008 মিলিগ্রাম / দিন বাড়ার জন্য স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে 10% হ্রাস ছিল।
ডায়েট্রি ফাইবার খাওয়া
চীনের ঝিজিয়াংয়ের হ্যাংজু ক্যান্সার হাসপাতালের গবেষকরা পাবমিড, এম্বেস, বিজ্ঞান ওয়েব, এবং কোচরান লাইব্রেরি ডাটাবেসে সাহিত্যের অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রাপ্ত 24 টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন এবং উচ্চ ডায়েটরি ফাইবার গ্রহণের সাথে মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে 12% হ্রাস পাওয়া গেছে। ডোজ-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে যে ডায়েটারি ফাইবার গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতি 10 গ্রাম / দিন বৃদ্ধির জন্য স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি 4% ছিল।
অ্যালিয়াম ভেজিটেবল
ইরানের তাবরিজ ইউনিভার্সিটি অফ মেডিকেল সায়েন্সেসের গবেষকরা তাবরিজে 285 স্তন ক্যান্সার মহিলাদের তথ্য মূল্যায়ন করেছেন, যাদের বয়স 25 থেকে 65 বছর এবং বয়স- এবং আঞ্চলিক-মিলিত হাসপাতাল ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং পাওয়া গেছে যে রসুন এবং লিকের উচ্চ ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি, যেখানে, রান্না করা পেঁয়াজের উচ্চ ব্যবহার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং তাই, এই খাবার স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য আদর্শ নাও হতে পারে।
লেবু
তেহরান মেডিকেল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি এবং ইরানের ইসফাহান মেডিকেল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জনসংখ্যা ভিত্তিক কেস-কন্ট্রোল স্টাডি থেকে প্রাপ্ত উপাত্তকে মূল্যায়ন করেছেন যাতে স্তন ক্যান্সারের ৩ 350০ রোগী এবং 700০০ টি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং পোস্টম্যানোপসাল মহিলা এবং সাধারণ ওজনের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গ্রুপ রয়েছে উচ্চ মাত্রায় লেগু খাওয়ার সাথে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি 46% হ্রাস পেয়েছিল যাঁরা কম লেগুম খাওয়েন তাদের তুলনায়।
ব্রাউন রাইস
নার্সদের স্বাস্থ্য স্টাডি II এর তথ্যের বিশ্লেষণে 90,516 থেকে 27 বছর বয়সের 44 প্রিমেনোপসাল মহিলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, প্রমাণিত শস্যের খাবার গ্রহণ স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে বাদামি চালের সেবনের সাথে ডায়েট সামগ্রিক এবং প্রিমেনোপসাল স্তন ক্যান্সারের কম ঝুঁকির সাথে যুক্ত হতে পারে।
ফিশ
আইসল্যান্ডিক হার্ট অ্যাসোসিয়েশন দ্বারা ১৯৯৮ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ৯,৩৪০ জন মহিলাকে জড়িত রাইজ্যাভিক স্টাডি, জনসংখ্যার ভিত্তিক কোহোর্ট স্টাডি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ, পাশাপাশি ২৮৮৮ জন মহিলার উপ-গোষ্ঠী থেকে জীবনের বিভিন্ন সময়কালীন ডায়েটের তথ্য যুগে প্রবেশ করেছেন, জিন / পরিবেশের সংবেদনশীলতা (এজিইএস) -রেকজাভিক স্টাডিতে দেখা গেছে যে প্রারম্ভিক বয়সে মধ্য বয়সে মাছের খুব উচ্চ মাত্রায় স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাসের সাথে যুক্ত হতে পারে।
বাদাম
২০১২-২০১৩ সালের মধ্যে breast৯ টি স্তন ক্যান্সার মহিলার ডেটা বিশ্লেষণে একক পাবলিক হাসপাতাল সেন্টার, ইন্সটিটো এস্তাতাল ডি ক্যান্সারলজিয়া ডি কলিমা, মেক্সিকো থেকে নিয়োগ করা হয়েছে এবং স্তন ক্যান্সারের পূর্ববর্তী ইতিহাস / লক্ষণ / লক্ষণ ছাড়াই সাধারণ ম্যামোগ্রামের ১০৪ জন মহিলা রয়েছেন, যা উচ্চতর ডায়েটের অংশ হিসাবে বাদাম খাওয়ানো স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিটিকে দু'বার তিনবার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।
গ্রিন টি
ইতালির পেরুগিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষকরা করেছেন ৮ টি সমীক্ষা সমীক্ষা এবং ১ case৩,৮১০ জনকে জড়িত ৫ টি কেস-নিয়ন্ত্রিত সমীক্ষার ভিত্তিতে ১৩ টি গবেষণার উপর ভিত্তি করে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে গ্রিন টি সেবনের ফলে স্তন ক্যান্সারের পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকি ১৫% কমেছে। তবে, বিশ্লেষণে এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় নি যে গ্রিন টি স্তন ক্যান্সারের প্রকোপের ঝুঁকি হ্রাস করতে সক্ষম।
আপেল, কলা, আঙ্গুর, কমলা এবং নারিকেল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বোস্টনের হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথের গবেষকদের দ্বারা প্রকাশিত একটি গবেষণায় এবং নার্সদের স্বাস্থ্য স্টাডি ২-এর ২-90476-৪৪ বছরের মধ্যে 27 প্রিমেনোপসাল মহিলা অংশগ্রহণকারীদের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে যে উচ্চতর বয়ঃসন্ধিকালে আপেল, কলা, আঙ্গুর এবং কম বয়সে কমলা এবং কালের সেবনের ফলে এস্ট্রোজেন রিসেপ্টর (ইআর) - স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ভালো ফ্যাট গ্রহণ করুন
ওমেগা-৩, ভুট্টা, সূর্যমুখীর তেল এইসব ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার বা খারাপ ফ্যাট যুক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কারণ এইসকল ফ্যাট বা বিভিন্ন ধরণের চর্বি ব্রেস্ট ক্যান্সারের উপর অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করে। তাই মাছের তেল এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার খান।
নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট
অনেক সময় খাবারে পরিমিত পুষ্টি, ভিটামিন ও মিনারেল নাও পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন। যা আপনার স্তন ক্যান্সার সহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। তাই চেষ্টা করবেন পর্যাপ্ত মাত্রার ভিটামিন এ, ডি ও ই সমৃদ্ধ খাবার বাসাপ্লিমেন্ট খেতে। যা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীরা নিয়মিত ৩০-৪০ মিনিট ব্যায়াম বা ইয়োগা করেন তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ২৫-৪৫% কমে যায়। তাই অবশ্যই প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট সময় করে যেকোনো ব্যায়াম করুন। আর সেটাও সম্ভব না হলে দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করুন।
ওজন ঠিক রাখুন
বাড়তি ওজন অন্যান্য রোগের পাশাপাশি স্তন ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। যারা নিয়মিত ব্যায়াম বা ডায়েট করেন না তাদের ওজন খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ফলে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তাই স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে দেহের স্বাভাবিক ওজন ঠিক রাখা জরুরি।
ধূমপান বর্জন করুন
যেসব নারীরা ধূমপানে আসক্ত বা অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস আছে। তাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে ৩০% থেকে ৪০% এরও বেশি। তাই এই অভ্যাসগুলো থাকলে আজই পরিত্যাগ করার চেষ্টা করুন।
স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কি এবং কখন করবেন???
স্তন ক্যান্সারের কোন লক্ষণ বা উপসর্গ নেই এমন ব্যক্তির মধ্যে থেকে খুব সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ের পদ্ধতিকেই ক্যান্সার স্ক্রিনিং বলে। এই স্ক্রিনিং টেস্ট বয়স ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণের উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। এই স্ক্রিনিং এর জন্য তিন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে, তা হলো –
1. Breast self examination (BSE)
প্রতি মাসে একবার এই পরীক্ষা করতে হবে। 20 বছর বয়স থেকে শুরু করে একজন মহিলা সারা জীবন নিজেই এই পরীক্ষা করতে পারেন। মাসিক ঋতুস্রাব শেষ এর ১ সপ্তাহের মধ্যে এই পরীক্ষা করলে ভালো হয়। যাদের নিয়মিত মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে বা কোন কারণে অনিয়মিত হয় ,তারা প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট তারিখে এই পরীক্ষা করতে পারেন।
2. Clinical breast examination (CBE)
30-40 বছর বয়স সীমার মাঝে যারা আছেন ,তারা প্রতি ৩ বছর পর পর ১ বার এবং ৪০ ঊর্ধো বয়সী নারীরা প্রতি বছর ১ বার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে এই পরীক্ষা করাবেন । এছাড়াও যদি কেউ স্তনে অস্বাভাবিক কোন পরিবর্তন লক্ষ করেন তাহলেও সাথে সাথেই চিকিতসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
3. Mamogram/ম্যামোগ্রাম
এটি স্তনের একটি বিশেষ ধরণের এক্স-রে, যার মাধ্যমে স্তনে খুব ছোট কোন চাকা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে। উন্নত বিশ্বে স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ে ম্যামোগ্রাম খুবই জনপ্রিয় এবং কার্যকরী পরীক্ষা। তবে আমাদের দেশে এই পদ্ধতি খুব একটা সহজলভ্য নয় এবং ব্যায়বহুলও বটে। তাই যারা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে আছেন তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এই পরীক্ষাটি করবেন।
মনে রাখবেন প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার নির্ণয় করা গেলে তা সম্পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভবনা অনেকগুণ বেড়ে যায়।
স্তন ক্যান্সার নির্নয়ের পদ্ধতি সমূহ
সেলফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন, ক্লিনিকাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন বা ম্যামোগ্রাফী তে সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়লে চিকিৎসক আরো নিশ্চিত হবার জন্য বিভিন্ন ধরণের টেস্ট দিতে পারেন। এর মধ্যে এফ এন এ সি, বায়োপসি, কোর নিডোল বায়োপসি এবং ইমুয়নো হিস্টোকেমিস্ট্রি উল্লেখযোগ্য। আর এতে যদি স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে তবে চিকিৎসক রোগীর প্রয়োজনে ক্যান্সার স্টেজিং নির্ধারণের জন্য নানা পরীক্ষা দিতে পারেন।
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা
স্তন ক্যান্সারে সাধারণত সার্জারী, কেমোথেরাপী, রেডিওথেরাপী, হরমোন থেরাপী ইত্যাদি চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কোন সময়ে কোন চিকিৎসা প্রয়োজন তা একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই পরামর্শ দিতে পারেন।
ব্রেস্ট ক্যান্সার বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ আর এতই বিশাল যে এ সম্পর্কে একবারে সব বলা সম্ভব নয়। ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে জরুরী আরো কিছু তথ্য, রোগ নির্ণয় পদ্ধতি ও চিকিৎসা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানাবো পরের আরেকটি লেখায়। সে পর্যন্ত সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।
0 Comments