ফুসফুস পরিষ্কার রাখবে যেসব খাবার

বর্তমানে নিজেকে অসুখ থেকে মুক্ত রাখাই অন্যতম চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিনের নানা অনিয়ম আমাদের খুব সহজেই কাবু করে ফেলে। ধূমপান, দূষণ ইত্যাদির কারণে ফুসফুস শুকিয়ে যেতে থাকে। মহামারির এই সময়ে কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে শ্বাসকষ্ট এবং ফুসফুসের অসুখেই। ফুসফুস ভালো রাখতে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া জরুরি। 


করোনাভাইরাসের কারণে সবেচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুসফুস ভালো রাখতে হলে সিগারেটসহ নেশাজাতীয় সব ধরনের অভ্যাস বন্ধ করতে হবে। সেইসঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে খাবারের দিকে। খেতে হবে এমন সব খাবার যেগুলো ফুসফুস ভালো রাখার জন্য কাজ করে। চলুন জেনে নেওয়া যাক-

1. বেরি জাতীয় ফল

ফুসফুস ভালো রাখতে নিয়মিত খেতে হবে বেরি জাতীয় ফল। এতে থাকে প্রচুর অ্যান্থ-স্যানিনস। আমাদের ফুসফুস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রেডিক্যাল কারণে। এটি রোধে কাজ করবে এ ধরনের ফল। সেইসঙ্গে এতে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলে। 

2. সবুজ শাক-সবজি

সবুজ শাক-সবজি খাওয়ার অনেকগুলো উপকারিতার মধ্যে একটি হলো, আমাদের ফুসফুস ভালো রাখার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। সবুজ শাক-সবজি খেলে তা ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি থেকেও দূরে রাখে। প্রতিদিনের খাবারে এসব শাক-সবজি রাখা আবশ্যক। মেথি শাক, পালং শাক, ব্রকোলি, বরবটি, শিম, মটরশুঁটি এসব শাক-সবজি নিয়মিত খাবেন।

3. লাল রঙের সবজি

নানা রঙের সবজি কিনতে পাবেন বাজারে। তার ভেতরে টুকটুকে লাল রঙের সবজিও কম নয়। যেমন ধরুন পাকা মরিচ, লাল ক্যাপসিকাম এবং টমেটো হলো লাইকোপেন সমৃদ্ধ। এতে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফুসফুসের সমস্যা সারাতে বেশ কার্যকরী। সেইসঙ্গে শরীরে সৃষ্ট প্রদাহ কমাতেও কাজ করে এসব সবজি। যারা ক্রনিক রোগে ভুগছেন, তাদের জন্য বেশ উপকারী হতে পারে লাল রঙের সবজি।

4. কফি

কফিতে থাকা ক্যাফেইন ফুসফুসের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে তা খেতে হবে পরিমিত। কফি কিন্তু প্রদাহ কমাতেও সাহায্য করে। এতে প্রচুর পলিফেনলস থাকার কারণে ফুসফুসকে ভালো রাখে। তাই নিয়মিত কফি পান করুন। এটি আপনাকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।

5. লবণ

লবণও কিন্তু হাঁপানির উপসর্গকে কমিয়ে দিতে পারে। তাই ফুসফুস ভালো রাখতে প্রয়োজনীয় লবণ যোগ করুন খাবারে। তবে অবশ্যই বাইরে থেকে কিনে আনা প্যাকেটজাত খাবার খাবেন না। বরং বাড়িতে তৈরি খাবার খান। এতে ভালো থাকবে ফুসফুস।

6. আপেল

আপেল খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় বলা হয়, সপ্তাহে যারা দুটি থেকে পাঁচটি আপেল খায়, তাদের অ্যাজমা হওয়ার ঝুঁকি ৩২ ভাগ কমে যায়। আপেলের মধ্যে রয়েছে ফ্লাবোনয়েড। এটি শ্বাস নেয়ার পথকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে, ফুসফুসকে ভালো রাখে।

7. গাজর

গাজর বেটাক্যারোটিন এবং অন্যান্য অ্যান্টি অক্সিডেন্টের জন্য প্রসিদ্ধ। গবেষণায় বলা হয়, বেটাক্যারোটিন শরীরেও গিয়ে ভিটামিন ‘এ’ তে রূপান্তরিত হয়। ফুসফুস ভালো রাখতে গাজর এশটি চমৎকার খাবার।

8. রসুন

রসুনের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিইনফ্লামেটোরি উপাদান। দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ভাইরাস জনিত সংক্রমণ প্রতিরোধে রসুন ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রসুন অ্যাজমা প্রতিরোধ করে, প্রতিরোধ করে ফুসফুসের ক্যানসারও।

9. ভিটামিন-ডি

ভিটামিন-ডি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে থাকে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে ভিটামিন-ডি এর ঘাটতি দেখা দিলে ফুসফুসের রোগ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। সূর্যের আলো এর অন্যতম উৎস্য। পাশাপাশি দুধ, ডিম, দই, মাছ, মাংস ইত্যাদি থেকেও পাওয়া যায় ভিটামিন-ডি।

10. মশলা

বেশ কিছু মশলা আছে যেগুলো ফুসফুসের কার্যকারিতা সঠিক রাখতে, প্রদাহ জনিত সমস্যা রোধে ও নানা সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। যেমন কাঁচাহলুদ এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। বায়ুবাহিত দূষিত এলাকা প্রভাব থেকে ফুসফুসকে রক্ষা করে। কফ ও অ্যাজমা সমস্যা সমাধানে কার্যকর। পেঁয়াজ, রসুন ও আদা এন্টিইনফ্লামেটরি হিসেবে কাজ করে। নানা সংক্রমণ থেকে ফুসফুসকে রক্ষা, ফুসফুসের রক্ত সঞ্চালন উন্নত ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। কালোজিরা এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ও শ্বাসনালীর প্রদাহ কমাতে কার্যকর।

11. গুড় ও মধু

আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, গুড় ফুসফুসকে উষ্ণ রাখতে ও বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে থাকে। আর মধু ফুসফুস পরিষ্কার রাখতে কার্যকর পাশাপাশি এটি এন্টিঅক্সিডেন্ট, এন্টিমাইক্রোবিয়াল ও এন্টিইনফ্ল্যামেটরি হিসেবে কাজ করে।

12. অ্যাভোকাডো

অ্যাভোকাডোর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, এর মধ্যে রয়েছে রোগ নিরাময়কারী গুণ। এটি ফ্রিরেডিকেলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখে। ফুসফুসকে ভালো রাখতে বেশ উপকারি খাবার অ্যাভোকাডো।

13. পর্যাপ্ত পানি পান

পানির চেয়ে অধিক ভালো ও অধিক কার্যকর আর কি হতে পারে? শরীর বিষমুক্তকরণের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে পানি পান করা। এটা মনে রাখা ভালো যে শুষ্ক ফুসফুসে অস্বস্তি ও প্রদাহ বেশি হয়। শারীরিক পানিশূন্যতা এড়াতে প্রতিদিন ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করুন।

14. দানাশস্য

লাল চাল, লাল আটা বা এদের তৈরি সামগ্রী, ওটস্, বার্লি ইত্যাদি ফুসফুস ভালো রাখতে কার্যকর। এগুলো থেকে যে খাদ্য আঁশ পাওয়া যায় তা যেমন ফুসফুসের জন্য উপকারী তেমনি এতে রয়েছ এন্টি অক্সিডেন্ট, এন্টি ইনফ্লামেটরি বৈশিষ্ট্য, ভিটামিন-ই, সেলেনিয়াম ও অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড, যা ফুসফুসের কার্যকারিতা সঠিক রাখতে ও ফুসফুসকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

15. প্রোটিন

দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, বাদাম, ডাল, নানা বীজ জাতীয় খাবার ইত্যাদি প্রোটিনের উত্স হিসেবে কাজ করে থাকে। প্রতিদিন পরিমাণ মতো প্রোটিন খাবার তালিকায় রাখলে তা শ্বাসযন্ত্রের পেশি বা ফুসফুসের পেশির কার্যকারিতা সঠিক রাখে।

16. আখরোট

আখরোট হচ্ছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের সমৃদ্ধ উৎস। একমুঠো আখরোট বাদাম অ্যাজমা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রীয় সমস্যায় লড়ে যেতে সহায়ক হতে পারে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রদাহনাশক পুষ্টি বলে প্রদাহজনিত রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।

17. ব্রোকলি

ব্রোকলিতে উচ্চ পরিমাণে ভিটামিন সি, ক্যারোটিনয়েড, ফোলেট ও ফাইটোকেমিক্যাল পাওয়া যায়- এসবকিছু ফুসফুসকে ধ্বংসাত্মক উপাদান থেকে রক্ষা করে। ব্রোকলিতে এল-সালফোরাফ্যান নামক সক্রিয় উপাদান রয়েছে, যা কোষকে প্রদাহনাশক জিন সক্রিয় করতে কৌশল খাটায়- এভাবে শ্বাসতন্ত্রীয় সমস্যা এড়াতে সাহায্য করে।

18. ঝালমরিচ

ঝালমরিচের ক্যাপসাইসিন শ্লেষ্মা নিঃসরণে উদ্দীপ্ত করে এবং শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিকে সুরক্ষা দেয়। ঝালমরিচের চা পান করতে পারলে সবচেয়ে ভালো, এটাও বিটা-ক্যারোটিনের আরেকটি ভালো উৎস। বিটা-ক্যারোটিন অ্যাজমার অনেক উপসর্গ প্রশমিত করতে পারে।

19. আদা

আদা কেবলই প্রদাহনাশক নয়, এটি বিষমুক্তকরণে সহায়তা করে এবং ফুসফুস থেকে দূষণকারী পদার্থ দূর করে। আদা শ্বাসতন্ত্রের বদ্ধতা দূর করে, বায়ুপথগুলোকে খুলে দেয় ও ফুসফুসে সঞ্চালন বৃদ্ধি করে- এভাবে ফুসফুস অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়।

20. হলুদ

কাঁচা হলুদে থাকা কারকুমিন উপাদান যেকোন ধরনের প্রদাহ কমায়। সেই সঙ্গে ফুসফুস পরিষ্কার করে এর কার্যকারিতা বাড়ায়। ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রতিদিন একটু টুকরা কাঁচা হলুদ চিবিয়ে কিংবা দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পারেন। এ উপাদানটি বায়ুপথের প্রদাহ ও অ্যাজমার সঙ্গে সম্পৃক্ত বুকের টানটান ভাব কমিয়ে ফেলে।

21. গ্রিন টি

গ্রিন টি প্রাকৃতিকভাবে ফুসফুস পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এতে থাকা পলিফেনল, অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান ফুসফুসের প্রদাহ কমায় ও এর কার্যকারিতা বাড়ায়।

22. তুলসী পাতা

তুলসী পাতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। আর এই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ফুসফুস সুরক্ষায় খুবই কার্যকর। বাতাসে থাকা ধূলিকণা শোষণ করতে পারে তুলসী। তাই শ্বাসযন্ত্রের দূষিত পদার্থ দূর করতে তুলসীপাতার রস কিংবা এই পাতা পানিতে ফুটিয়ে পান করুন। ফুসফুস ভালো থাকবে।

23. কালোজিরা

ফুসফুস ভালো রাখতে কালোজিরা অনেক ভালো কাজ করে। এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শ্বাসনালির প্রদাহ রোধ করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন আধা চা চামচ কালোজিরার গুঁড়া এক চা চামচ মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ফুসফুস ভালো থাকবে।

24. ভিটামিন সি

ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবারের কোনো বিকল্প নেই। ফুসফুসের প্রদাহজনিত সমস্যা রোধ করে এই ভিটামিন। শ্বাসযন্ত্রে অক্সিজেন সরবরাহ করতে সাহায্য করে এবং শ্বাসনালির জীবাণু ধ্বংস করে। লেবু, আমলকি, কমলা, আপেল, পেয়ারা ইত্যাদি খাবারে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে।

শুধু খাবারের উপর নির্ভর হলে চলবে না ফুসফুস সুস্থ রাখতে শারীরিক কসরতের বিকল্প নেই। শরীর সুস্থ রাখার পাশাপাশি ব্যায়াম আপনার ফুসফুসকে ভালো রাখবে। এ জন্য এরোবিক্স, ইয়োগা বা কার্ডিও এক্সারসাইজ প্রতিদিন করতে হবে।


Post a Comment

0 Comments